আজ ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কলেজ শিক্ষক আউসাফকে ২৭ মাস ধরে বন্দী রাখার সীমাহীন বর্বরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

আউসাফ আলী (৫০) নামে একজন কলেজ শিক্ষককে ২৭ মাস ধরে একটি কক্ষে বন্দী রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই দাড়ি, গোফ, চুলে রীতিমত বুনো মানুষে পরিনত হয়েছেন। তার হাত পায়ের নক দুই আড়াই ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা লম্বা হয়েছে।

একটি জানালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে তাকে রুটি, বিস্কুট, শুকনো খাবারসহ পানির বোতল সরবরাহ দেওয়া হলেও আর কোনো খোঁজ খবর নেয় না কেউ। অসুখ বিসুখে চিকিৎসাও জোটে না তার। সম্পূর্ণ অমানবিক এ ঘটনাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। আউসাফ আলীর ছোট ভাই জামশেদ আলী মিরপুর শাহআলী থানার প্রিয়াংকা হাউজিং সোসাইটির মাতৃছায়া নামের একটি বাড়ির আট তলার নির্জন কক্ষ ভাড়া নিয়ে তার বড় ভাইকে বন্দী রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তিন চার দিন পর পর জামশেদ আলী নিজে গিয়ে জানালার ফাঁক গলিয়ে রুটি, বিস্কুট, মুড়িসহ কিছু শুকনো খাবার ও পানির বোতল ছুঁড়ে দিয়েই ফিরে যেতেন। তবে খাবার পেকেট নিয়ে আসা যাওয়ার সময় সর্বদা জামশেদ আলীর হাতে মোটা বেতের লাঠি দেখতে পেতেন আশপাশের ভাড়াটেরা।

অবশ্য তাদের বয়োবৃদ্ধা মা আউসাফ আলীকে বন্দিকারী জামশেদ আলীকে মানসিক রোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ পরিবারের গুলশানে বড় আয়তনের বাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সহায় সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ জবর দখল করার চক্রান্ত হিসেবেই মাসের পর মাস আউসাফ আলীকে গুম করে রাখা হচ্ছে কী না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শাহআলী থানায় জমা দেওয়া ভাড়াটে তথ্য ফরমে উল্লেখ রয়েছে, মিরপুরের অভিজাত এলাকা মাল্টিপ্ল্যান রেড ক্রিসেন্ট সিটি’র স্থায়ী বাসিন্দা শেখ জামসেদ আলী তার ভাই শেখ আউসাফ আলীকে বন্দী রাখার জন্য ২০১৯ সালের ১ আগস্ট শাহআলী থানার প্রিয়াংকা হাউজিং সোসাইটির তিন নম্বর রোডের ২৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের মাতৃছায়া বাড়ির নির্জন কক্ষটি ভাড়া নেন। সিঁড়ি ঘেষা দরজাচি সদা সর্বক্ষণ বাইরে থেকে তালাবদ্ধ রাখা হয়। একটি জানালা খোলার ব্যবস্থা রাখা হলেও বাকি জানালাগুলো বাইরে থেকেই পেড়েক মেরে আটকে দেয়া রয়েছে। ওই কক্ষটির আশপাশে আর কোনো ফ্ল্যাট বা কক্ষেরও অবস্থান নেই। তবে ৭ তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকা বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাঝে মধ্যেই উপর তলা থেকে বিকট চিৎকার কিংবা গোঙ্গানীর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। তবে অষ্টম তলায় কোনো ভাড়াটের উঠা সম্পূর্ণ ভাবে নিষেধ ছিল।

দেশপত্র’র সিনিয়র রিপোর্টার মনিরুজ্জামানের দেওয়া তথ্যসূত্র ধরে গতকাল র‌্যাব-৪ এর একাধিক টিম মাতৃছায়া ভবনটি ঘিরে অভিযান চালায়। তারা বন্দীদশাগ্রস্ত শেখ আউসাফ আলীর কক্ষে ঢুকে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে পান। সেখানে খালি মেঝেতে আউসাফ আলীকে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতে দেখেন। তার চারপাশে মুড়ি, বিস্কুট, পানির বোতল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।

সাবেক ইউএনও শেখ আশফাক আলীর চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বড় হচ্ছেন আউসাফ আলী। তার দুই ভাই ও দুই বোন অষ্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা। বৃদ্ধা মাও থাকেন সেখানে। তাদের গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার কাগুজীপাড়া গ্রামে। তাদের গ্রামে এবং ঢাকায় পর্যাপ্ত সম্পদ থাকার তথ্য জানা গেছে। ছোট ভাই জামশেদ পড়াশুনার জন্য রাশিয়ায় ছিলেন এবং সেখানেই বিবাহ করেছিলেন এবং তার একটি শিশু সন্তানও ছিল। সব ফেলে জামশেদ আলী ২০১৩/১৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ২০১৬ সালে দেশে একজন নার্সকে বিয়ে করে সংসার গড়েন।

জামশেদ জানান, তার বড় ভাই গুলশানের একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। ২০১৬ সালের পর থেকেই আউসাফ আলীর মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তবে এ সংক্রান্ত কোনো ডাক্তারি কাগজপত্রাদি জামশেদ দেখাতে পারেননি। কেউ কেউ বলেছেন, নার্সকে বিয়ে করার পর পরই জামশেদ তার বড় ভাইকে বন্দী রাখতে শুরু করেন। পুলিশ ও র‌্যাব এ বিষয়ে খোজ খবর নিতেই জামশেদ আলী তার বড় ভাইকে চুপিসারে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে মাতৃছায়া বাড়ির মালিকের ভ‚মিকা নিয়ে। স্থানীয়রা অমানবিক এ বন্দীশালার বিষয়ে তিনি জেনেশুনেই নিজ বাড়ির আট তলার রুমটি ‘প্রাইভেট জেলখানা’ আদলে ভাড়া দিয়েছিলেন কোন্ বিবেকে? আইনগত ভাবেও তা ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসেবে গণ্য বলেও অভিমত প্রকাশ করেছে আইন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ
%d bloggers like this: