আজ ১৫ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

এখনো খোলা আকাশের নিচে আম্ফান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত যশোরের শার্শা’য় হাজারো নিম্নে আয়ের মানুষ

খোরশেদ আলম :

করোনা পরিস্থিতির এমনিতে অসহায় যশোরের শার্শা উপজেলাবাসী তারই মধ্যে সুপার সাইক্লোন আম্ফান ঝড় – অধিক শক্তিশালী হয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে জনজীবন, বাড়িঘর উড়িয়ে করেছে নিরাশ্রয়।সরেজমিনে দেখা গেছে, এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটা গ্রামে নিম্নে আয়ের মানুষের বসতভিটার ঘরবাড়ি ও গাছপালা ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘুর্ণিঝড় আম্ফান এবং করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই আম্ফান ঝড়ে থমকে গেছে শার্শার জনজীবন।

শার্শা উপজেলা’য় বেনাপোল পৌরসভাসহ হাজার হাজার মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখনো আসেনি সাহায্যের কোনো ত্রাণসামগ্রী। বিশেষ করে উপজেলার নিম্নে আয়ের বস্তিবাসী খোলা আকাশের নিচে ট্রেন লাইনে রাত কাটাচ্ছেন। রোদ বৃষ্টি বয়ে চলেছে তাদের শরীরের উপর দিয়ে। ঈদের আনন্দও তাদের ধুলোয় মিশে গিয়েছে। একদিকে করোনা আতঙ্কে কর্মহীন মানুষ ঘরবন্দি হয়ে আছে। অন্যদিকে আম্ফানের মতো এত বড় ঝড় বয়ে যাওয়ায় মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে।

সরেজমিন দেখাগেছে, বেনাপোল বন্দরের ভবেরবেড় ও শার্শা উপজেলা সদরের রেলের বস্তিতে বসবাসরত মানুষের ঘরবাড়ি উড়িয়ে বাড়িহারা করেছে হাজার হাজার মানুষের। সেই সাথে শাহিন নামে একজনের প্রাণও কেড়ে নিয়েছে। জানাগেছে, খবর পেয়ে বেনাপোল পৌরমেয়র জরুরি ভিত্তিতে সেখানে কিছু সংখ্যক ঈদ উপহারসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছিল। কিন্তু এসব মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে গৃহ নির্মাণের। হাতে টাকা নেই, করোনার জন্য কাজ নেই। ছোট ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে পড়েছে বিপাকে এসব পরিবারের গৃহকর্তারা। এসব মানুষের পালিত হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলও হয়ে পড়েছে বাসস্থান শূন্য। এসব পশুপাখিও খাদের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ঝড় আম্ফানের আঘাতে বেনাপোল পৌরসভার প্রতিটি গ্রামসহ শার্শা উপজেলা’য় ও ১৮২টি গ্রামে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হাজার কোটি টাকার উপরে। এই উপজেলার প্রায় গ্রামে আছে গরুর খামার। আছে অনেকেরই আম ও কলাচাষের বাগান। শত শত বিঘা আম, কাঠাল ও চাষিদের লেবু পড়ে গাছতলায় নষ্ট হয়ে গেছে।

বেনাপোল পৌরসভার ভবেরবেড় গ্রামের খায়রুন নাহার, সুফিয়া বেগম, পিক্কা খান, রাবেয়া বেগম তরিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ঘরে কিছু নেই। সরকারি ট্রেন লাইনের পাশে ছোট ছোট ঘর বেঁধে আমরা বসবাস করি পরিবার পরিজন নিয়ে। ঝড়ে ঘরের সাথে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও উড়িয়ে নিয়ে এলোমেলো করে ফেলেছে। আমরা এখন ট্রেন লাইনের উপর রাত কাটাচ্ছি। বৃষ্টি-রোদ সব কিছু আমাদের গায়ের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। এদিকে শার্শা সদরের রেললাইন পাড়ার আখের আলী, আজগর আলী, সুমন, কালু, আজহারুল, মালেকা খাতুন নেদু সহ নাম না জানা আরো অনেকেরই ঘরবাড়ী ভেঙে গিয়েছে। অনেকেরই ঘরের ছাউনি ঝড়ে উড়ে ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। দেখাগেছে শার্শা’র চটকাপুতা গ্রামে ও একই অবস্থা।

তারা অভিযোগে আরো জানান এপর্যন্ত কোন মেম্বর-চেয়ারম্যান বা সরকারি লোক তাদের খোঁজ-খবর নিতে কিংবা দেখতে যায়নি এ পর্যন্ত পায়নি কোন অনুদান। বস্তির একজন ভিক্ষুক বলেন, আমরা খুব কষ্টে দিন যাপন করছি। আমাদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দিলে আমরা খুশি থাকতাম। ধারদেনা করে অনেকেই এবং উপজেলার টিন ও হার্ডওয়ার দোকানগুলো থেকে বাকী নিয়ে বিদ্ধস্ত ঘর-বাড়ী মেরামত করেছেন। আবার অনেকেই ঝড়ের আঘাতে ভেঙে যাওয়া তাদের ঘর মেরামত করতে পারেননি। তারই ধকল সইতে না সইতে ১সপ্তাহ পর এরই মধ্যে আবারো আঘাত হেনেছে বজ্রবৃষ্টি সহ আরেকটি ঝড়।

গত (বুধবার ২০ মে) সন্ধা আনুমানিক ৭টা ১৫মিনিট এর দিকে প্রচন্ড গতিতে ঝড়টি শুরু হয়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েক স্থায়ী ছিলো। আর তাতেই যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশে থাকা রেন্টি গাছের মোটা মোটা ডালপালা ভেঙ্গে রাস্তার উপর পড়তে দেখা গেছে।
এদিকে আরো জানাগেছে, এ উপজেলায় উত্তর পচ্চিম থেকে বয়ে যাওয়া ঝড়হাওয়ায় অনেক গ্রামে গাছপালা সহ ঘরবাড়ি ভেঙেগেছে এবং বিদ্যুৎ এর তার ছিড়ে গেছে।

উল্লেখ্য: কয়েক যুগ পরে দক্ষিন-পশ্চিমা অঞ্চলে আঘাত আনা ঘূর্নি ঝড়ের কবলে শার্শা উপজেলার বৈদেতিক লাইন, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। গত ২০ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যা হতে শুরু হওয়া ঝড়ের অনেকেরই ধারনা করে জানান মনে হয় ৩০০ থেকে ৪০০ কিঃ মিঃ গতি ছিলো। আমাদের জিবনে এরকম ঝড় কোন সময় দেখিনি। তবে এই অঞ্চলে আবহাওয়ার কোন শাখা না থাকাতে ঝড়ের গতি সঠিকটা জানা যায়নি। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,জনবসতী এলাকার ঘর-বাড়ী ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন সুত্রে জানা যায়।

শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গাছ চাপা পড়ে ৪জন ব্যাক্তি মৃত্যু বরন করেছেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির শার্শা জোনাল অফিসের সহকারী জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার মোঃ নেয়ামুল হাসান বলেন, উপজেলা ১১টি ইউনিয়নে ঝড়ে লাইনে গাছ পড়ে বৈদেতিক খুঁটি ভেঙ্গে লাইনের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঈদের আগে মেরামত করে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা থাকলেও এখনো বেশ কয়েকটা গ্রাম বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সংযোগ না দেওয়াতে কয়েকটা গ্রামে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। সুত্রে জানাগেছে, পল্লী বিদ্যুৎ এর কতিপয় কর্তৃপক্ষ দালালের মাধ্যমে টাকা দাবি করছেন। টাকা দিলে সংযোগ পাচ্ছেন আর টাকা না দিলে সংযোগ দেয়া থেকে বিরত থাকছেন।

এখন বর্ষা মৌসুম প্রায় প্রতিনিয়ত ঝড়হাওয়া সহ বজ্রবৃষ্টি হচ্ছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষের সরকারের কাছে দাবি – সঠিক যাচাই বাচাইয়ের মাধ্যমে তাদেরকে সাহায্য অনুদান দেওয়ার দাবী জানান তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ
%d bloggers like this: